
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন ইস্যু সামাল দিতেও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের অদক্ষতা দৃশ্যমান হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি কারাগারের ফটকে স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ দেখার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয় যশোর কারাগারে বন্দি বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের বিষয়টি। স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পর প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের ব্যাখ্যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন পান তিনি। এ ঘটনায় কার কাছে ও কীভাবে আবেদন করতে হবে, বন্ধের দিন থাকার অজুহাত এবং আবেদনপত্র না পাওয়ার মতো প্রশাসনিক ব্যাখ্যাগুলোকে মাঠপর্যায়ের অনভিজ্ঞতা ও অপেশাদারিত্বের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, ঘটনাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত ও মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। মাঠপর্যায়ে দায়িত্বশীলদের স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন সামনে রেখে সরকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) বড় ধরনের রদবদল করেছে। ডিসিরা রিটার্নিং অফিসার এবং ইউএনওরা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন। জানা গেছে, বর্তমানে দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ ডিসি ২৭ ব্যাচের এবং ইউএনওদের বড় অংশ ৩৭ ব্যাচের কর্মকর্তা। মাঠপ্রশাসনের কাজে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতার কারণে নির্বাচনের আগমুহূর্তে অদক্ষতার চিত্র ফুটে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যদিও মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ এ বিষয়ে বলেন, কাজ করতে করতেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয় এবং মাঠপ্রশাসনের কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে।
এর মধ্যেই গত ২০ জানুয়ারি আটজন ইউএনওর বদলি, পরদিন অবমুক্তির আদেশ বাতিল এবং পরবর্তী সময়ে পুরো বদলির আদেশ প্রত্যাহার—এমন ঘটনাও প্রশ্ন তুলেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ২২ দিন আগে এমন সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও আলোচনা চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে মাঠপ্রশাসনের কর্মকর্তারা রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবশালীদের অসদাচরণের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছেন না। প্রার্থী বা তাঁদের অনুসারীদের উসকানিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে কেউ কেউ পেশাদারিত্ব হারাচ্ছেন। এতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর ও বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলার সাম্প্রতিক ঘটনায় এ ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
এ ছাড়া প্রশাসনের ভেতরে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলির অভিযোগও উঠেছে। বগুড়ার ধুনট উপজেলায় সরকারি জমি দখল বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর ইউএনওকে দ্রুত বদলি করার ঘটনা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
নির্বাচনী সহিংসতা দমনেও মাঠপ্রশাসনের দুর্বলতা চোখে পড়ছে। ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরও দ্রুত দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শুধু নির্বাচন নয়, সাধারণ প্রশাসনিক কার্যক্রমেও মাঠপর্যায়ে অপেশাদার আচরণের নজির দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অভিযোগ জমা পড়ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। এসব ঘটনায় প্রশাসন বিব্রত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে এবারের নির্বাচনের আগে পুলিশ সুপারদের তুলনায় জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। অনেক জেলায় ডিসি ও এসপির মধ্যে পেশাগত দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, যা জেলা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাঁদের মতে, নির্বাচনকালীন সময়ের মতো সংবেদনশীল মুহূর্তে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ মাঠপ্রশাসনের বিকল্প নেই। অন্যথায় নির্বাচন ও সাধারণ প্রশাসনিক কার্যক্রম—উভয় ক্ষেত্রেই আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।