প্রিন্ট এর তারিখঃ Mar 15, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Mar 2, 2026 ইং
রূপগঞ্জের তাঁতপল্লিতে স্বপ্নপূরণ: ৬০ বছরে প্রথমবার জামদানি পরলেন মাসুদা

রূপগঞ্জের তাঁতপল্লিতে স্বপ্নপূরণ: ৬০ বছরে প্রথমবার জামদানি পরলেন মাসুদা
রূপগঞ্জ উপজেলার রূপসী গ্রামের বাসিন্দা মাসুদা বেগমের জীবন কেটেছে তাঁতের শব্দে। প্রায় ১১ বছর স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে বসে জামদানি শাড়ি বুনেছেন তিনি। কত শাড়ি যে তাঁর হাতে তৈরি হয়েছে, তার হিসাব নেই। তবে নিজের বোনা শাড়ি নিজে পরার ইচ্ছেটা বারবার চেপে রাখতে হয়েছে সংসারের টানাপোড়েনে। স্বামী-সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই ছিল বড় দায়িত্ব।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে দৃশ্যপট। এখন মাসুদা ও তাঁর স্বামী তাওলাত প্রধান আর তাঁতে বসেন না। তাঁদের চার ছেলে পৈতৃক পেশা ধরে রেখেছেন, সামলাচ্ছেন সংসারের হাল। সম্প্রতি ছেলেদের উপহার দেওয়া একটি জামদানি শাড়ি পরে জীবনে প্রথমবারের মতো বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছেন মাসুদা। প্রায় ৬০ বছর বয়সে প্রথমবার নিজের জন্য পাওয়া সেই শাড়ি পরেই তিনি উদ্বোধন করেন ছেলে ইয়াকুব প্রধানের নতুন শোরুম— ইয়াকুব জামদানী হাউজ। শোরুমটি করা হয়েছে তাঁদের নিজ বাড়িতেই।
মস্তিষ্কে টিউমারের অস্ত্রোপচারের পর কথা বলতে কিছুটা কষ্ট হলেও আনন্দের সুর ছিল মাসুদার কণ্ঠে। তিনি জানান, শাড়িটি চিকন সুতা ও হাফসিল্কে বোনা, সূক্ষ্ম নকশায় তৈরি একটি দামি জামদানি। শাড়িটি পরে তিনি এতটাই আবেগাপ্লুত হন যে, স্বামী খুশি হয়ে তাঁকে দুই হাজার টাকা সালামি দেন।
ছেলেদের উপহার পাওয়া শাড়ি নিয়ে মাসুদার উচ্ছ্বাস স্পষ্ট। তিনি বলেন, শাড়িটি খুব যত্নে রেখে দেবেন। সহজে ব্যবহার করবেন না; বড় কোনো অনুষ্ঠানেই কেবল পরবেন।
ইয়াকুব প্রধান জানান, দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল মাকে একটি দামি জামদানি উপহার দেওয়ার। অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মায়ের শাড়ির ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া পান তিনি। অনেকেই শাড়িটি কিনতে আগ্রহ দেখান। তবে ইয়াকুব স্পষ্ট করেছেন, এটি তাঁর মায়ের শাড়ি—বিক্রির জন্য নয়। আগ্রহীরা চাইলে একই নকশার শাড়ি প্রি-অর্ডার করতে পারবেন।
পারিবারিকভাবে তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ইয়াকুব বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে জামদানি ব্যবসা করে আসছেন তাঁরা। আগে পাইকারিভাবে বিক্রি করলেও গত দুই বছর ধরে অনলাইনে বিক্রি করছেন। এই আয়ের মাধ্যমেই মায়ের চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব হয়েছে।
ইয়াকুবের স্বপ্ন, একদিন ঢাকায় একটি বড় শোরুম করবেন। সেদিন আরও দামি জামদানি পরিয়ে মাকেই দিয়ে উদ্বোধন করাবেন। তাঁর ভাষায়, “মা সারা জীবন কষ্ট করেছেন। এখন তাঁর মুখে হাসি দেখাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
রূপগঞ্জের তাঁতপল্লির এক মায়ের এই ছোট্ট স্বপ্নপূরণের গল্প এখন অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে—ভালোবাসা, শ্রম আর পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ 69Bangla Tv