মহেশখালীতে আবারও অস্ত্রের চালান, সিএনজি থেকে ৮ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার।
আবদুর রহমান কক্সবাজার মহেশখালী থেকে।
মহেশখালীতে মাত্র আট দিনের ব্যবধানে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম এবং তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২১ আগস্ট উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি এলাকার পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ উদ্ধারের পর এবার ছোট মহেশখালীর ঠাকুরতলা চৌরাস্তা থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে আটটি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।
২৯ আগস্ট রাত সোয়া ৯টার দিকে ঠাকুরতলা চৌরাস্তা মোড়ে পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির সময় অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে কক্সবাজার জেলা পুলিশের প্রেস রিলিজে জানানো হয়েছে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আরও দুজন পালিয়ে যায়। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পরপর দুটি ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম মজুদের সঙ্গে সড়কপথে আটটি তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র পরিবহনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না। একই সঙ্গে এসব অস্ত্র কোথায় তৈরি হচ্ছে, কারা তৈরি করছে, কার কাছে যাচ্ছে এবং এর পেছনে স্থানীয় নাকি আন্তঃজেলা কোনো সরবরাহচক্র রয়েছে খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে উঠেছে।
চেকপোস্টে থামতেই পালানোর চেষ্টা, পুলিশের প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, ২৯ আগস্ট রাত ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের আদিনাথ জেটিঘাট এলাকা থেকে বদরখালীগামী সড়ক দিয়ে একটি সবুজ রঙের সিএনজি আসছিল। ঠাকুরতলা চৌরাস্তা মোড়ে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যরা গাড়িটিকে থামার সংকেত দেন। সিএনজিটি জগন্নাথ ফার্মেসির সামনে পাকা সড়কে থামার সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে থাকা কয়েক জন ব্যক্তি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পুলিশধাওয়া করে দুজনকে আটক করতে সক্ষম হলেও অপর দুজন পালিয়ে যায়। এরপর স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে সিএনজিতে থাকা একটি কালো রঙের ট্রাভেল ব্যাগ তল্লাশি করা হয়। ব্যাগের ভেতরে সাদা ও কালো পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায় আটটি আগ্নেয়াস্ত্র।
ব্যাগে ছিল আট অস্ত্রঃপুলিশের জব্দ তালিকা অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে একটি দেশীয় তৈরি রাইফেল, পাঁচটি দেশীয় তৈরি একনলা বন্দুক এবং একটি এলজি। অর্থাৎ প্রেস রিলিজে অস্ত্রের তালিকায় মোট আটটি অস্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে রাইফেল ও কয়েকটি একনলা বন্দুক বিশেষ কায়দায় দুই অংশে বিভক্ত করে পলি থিনে মোড়ানো ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।অস্ত্রগুলো এভাবে বহনের কারণ নিয়েও তদন্তকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পরিবহনের সুবিধা, গোপনীয়তা বজায় রাখা কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানোর উদ্দেশ্য ছিল কি না তদন্তে এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অস্ত্রের পাশাপাশি গ্রেপ্তার দুজনের কাছ থেকে দুটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ এসব মোবাইলের কললিস্ট, যোগাযোগের তথ্য ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করলে অস্ত্রের উৎস ও সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
আট দিন আগেই পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম এই ঘটনার মাত্র আট দিন আগে, ২১ আগস্ট রাতে শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি এলাকার পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে অস্ত্র তৈরির বাট, ট্রিগার ম্যাকানিজম, ব্যারেলের অংশ, স্প্রিং, রিসিভার কভার সদৃশ অংশসহ লেদ মেশিন, ড্রিল মেশিন, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রিক হেকসোসহ বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানের পর মহেশখালীতে তল্লাশি
ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়। সেই ধারাবাহিক তল্লাশির মধ্যেই এবার ঠাকুরতলা চৌরাস্তা থেকে তৈরি অস্ত্রের চালান আটকের ঘটনা সামনে এলো।
পাহাড় থেকে সড়ক একই চক্র?
দুটি ঘটনার সময়, স্থান ও আলামত বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে একদিকে দুর্গম পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম, অন্যদিকে সড়কপথে একসঙ্গে আটটি আগ্নেয়াস্ত্র। তবে এখন পর্যন্ত এই দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ করেনি পুলিশ। ফলে এটিকে একই চক্রের কর্মকাণ্ড হিসেবে চূড়ান্তভাবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে তদন্তের স্বার্থে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রথমত, উদ্ধার হওয়া আটটি অস্ত্র কোথায় তৈরি হয়েছিল? দ্বিতীয়ত, অস্ত্রগুলো মহেশখালীতেই তৈরি হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো এলাকা থেকে
আনা হয়েছিল? তৃতীয়ত,সিএনজিতে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ২১ আগস্টের পাহাড়ি ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না? চতুর্থত, অস্ত্রগুলোর গন্তব্য কোথায় ছিল? পঞ্চমত, এই অস্ত্রের অর্থদাতা, কারিগর, পরিবহনকারী ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের মধ্যে একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না?এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে পারলেই কেবল অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার পূর্ণ চিত্র সামনে আসতে পারে।
গ্রেপ্তার দুজন, পুলিশের প্রেস রিলিজ অনুযায়ী গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের হরিনখাইন দীঘিরপাড় এলাকার মোতাহের হোসেনের ছেলে মো.রুবেল মিয়া (৩৪) এবং
মহেশখালীর ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের ঠাকুরতলা এলাকার মৃত মনিন্দ্র দের ছেলে মানিক দে (৩৮)
পুলিশ জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয়
আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পলাতক দুজনকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে মোবাইল ফোন, অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় জব্দ হওয়া দুটি মোবাইল ফোন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হয়ে উঠতে পারে। তদন্তকারীরা চাইলে আইনগত প্রক্রিয়ায় এসব ফোনের কল রেকর্ড, যোগাযোগের ধরন,অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র যাচাই করতে পারেন। বিশেষ করে অস্ত্রের চালানটি কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় যাওয়ার কথা ছিল এই দুটি প্রশ্নের উত্তর পেতে ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু বাহক নয়, নেপথ্যের কারিগরদের খোঁজ জরুরি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু পরিবহনকারী বা বাহকদের গ্রেপ্তার করলেই অস্ত্রের উৎস বন্ধ করা সম্ভব নয় তদন্তে যদি উৎপাদক, সরবরাহকারী, অর্থদাতা ও ক্রেতাদের শনাক্ত করা যায়, তবেই পুরো চক্র ভেঙে দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে ২১ আগস্টের পাহাড়ি এলাকায় অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের পর আট দিনের মাথায় তৈরি অস্ত্রের চালান আটকের ঘটনা তদন্তকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২১ আগস্টের অভিযানে অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা এসেছে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে ওই ঘটনায় আরও জড়িত দের শনাক্তের চেষ্টা চলার কথা জানানো হয়েছিল।
নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ, মহেশখালীর পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকাগুলো ভৌগোলিকভাবে পুলিশের নিয়মিত নজরদারির জন্য চ্যালেঞ্জিং। এ ধরনের এলাকায় যদি অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম মজুত বা অস্ত্র তৈরির কার্যক্রম চলতে থাকে, তাহলে তা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে যদি সড়কপথে তৈরি অস্ত্র পরিবহনের ঘটনা যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু স্থানীয় অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সম্ভাব্য বৃহত্তর সরবরাহচক্রের দিকেও তদন্তকে নিয়ে যেতে পারে।
পুলিশের অভিযান অব্যাহত,কক্সবাজার জেলা পুলিশ জানিয়েছে, ২১ আগস্টের ঘটনার পর পুলিশ সুপারের নির্দেশে মহেশখালী থানা এলাকায় তল্লাশি ও পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ঠাকুরতলা চৌরাস্তা মোড়ে চেকপোস্ট পরিচালনার সময় সর্বশেষ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা হয়। পলাতক দুজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। এখন দেখার বিষয়, ঠাকুরতলার সিএনজি থেকে উদ্ধার হওয়া আটটি অস্ত্রের উৎস কোথায়,গন্তব্যই বা কোথায় ছিল এবং ২১ আগস্ট মিঠাছড়ির পাহাড়ে পাওয়া অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিললেই মহেশখালীতে অস্ত্রের কারবারের নেপথ্যের চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
A H M Hafizul Bari