ঢাকা | বঙ্গাব্দ

রংপুরের তাজহাট রাজবাড়ি: ইতিহাসের সাক্ষী এক অনন্য স্থাপত্য ও জাদুঘর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 22, 2026 ইং
রংপুরের তাজহাট রাজবাড়ি: ইতিহাসের সাক্ষী এক অনন্য স্থাপত্য ও জাদুঘর ছবির ক্যাপশন: রংপুরের তাজহাট রাজবাড়ি: ইতিহাসের সাক্ষী এক অনন্য স্থাপত্য ও জাদুঘর
ad728
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় প্রায় দশ বছর সময় ব্যয় করে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন একজন হিন্দু জমিদার এবং পেশায় স্বর্ণকার। লোকমুখে প্রচলিত আছে, তার তৈরি দৃষ্টিনন্দন ‘তাজ’ বা মুকুটের নামানুসারেই এলাকাটির নামকরণ হয় তাজহাট। প্রাসাদটির স্থাপত্যে প্রাচীন মুঘল রীতির প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। মাঝখানে বিশাল গম্বুজ, দুই পাশে বিস্তৃত দালান এবং সমগ্র কাঠামোর ভারসাম্যপূর্ণ নকশা প্রাসাদটিকে দিয়েছে এক রাজকীয় রূপ।

১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তাজহাট রাজবাড়ি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রংপুর বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সে সময় বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে রংপুরে এই বেঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং প্রাসাদটি আবার ভিন্ন ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়। ১৯৯৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর তাজহাট রাজবাড়িকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ২০০৫ সালে রংপুর জাদুঘরকে প্রাসাদের দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়, যা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে নতুন পরিচয় দেয়।

বর্তমানে জাদুঘরে প্রবেশ করলে দর্শনার্থীরা দেখতে পান দশম ও একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম, সংস্কৃত ও আরবি ভাষায় লেখা দুর্লভ পাণ্ডুলিপি এবং মুঘল আমলের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় গ্রন্থ। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ের কুরআন, মহাভারত ও রামায়ণের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি এখানে বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও কালো পাথরে নির্মিত হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর বেশ কয়েকটি প্রাচীন প্রতিকৃতি দর্শনার্থীদের ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যায়। জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রদর্শনীগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

প্রাসাদ চত্বরজুড়ে রয়েছে বিস্তৃত খোলা মাঠ, সারিবদ্ধ গাছপালা এবং প্রাসাদের দুই পাশে দুটি বড় পুকুর। নির্ধারিত প্রবেশমূল্যের বিনিময়ে জাদুঘরে প্রবেশ করা যায় এবং যানবাহন নিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রেও আলাদা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রায় ২১০ ফুট প্রশস্ত এই প্রাসাদটি উচ্চতায় প্রায় চার তলার সমান। ইতালীয় ঘরানার সাদা মার্বেল দিয়ে নির্মিত ৩১টি সিঁড়ি এবং একই মার্বেলের মেঝে প্রাসাদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রাসাদের পশ্চাৎভাগে একটি গুপ্ত সিঁড়ির অস্তিত্ব রয়েছে, যা নিয়ে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই সিঁড়ি একটি সুড়ঙ্গের মাধ্যমে ঘাঘট নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। যদিও নিরাপত্তাজনিত কারণে বর্তমানে সিঁড়িটি বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রাসাদের সামনের দিকের শ্বেতশুভ্র মার্বেলের ফোয়ারা কালের বিবর্তনে কিছুটা বিবর্ণ হলেও এখনও তার রাজকীয় সৌন্দর্য অনুভব করা যায়। কথিত আছে, এই ফোয়ারাটি বিশেষভাবে রাণীর জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল।

পূর্বমুখী এই দুইতলা প্রাসাদের সম্মুখভাগ প্রায় ৭৬ মিটার দীর্ঘ। মাঝখানে প্রশস্ত সাদা মার্বেলের সিঁড়ি উপরের তলায় নিয়ে যায় এবং ছাদের কেন্দ্রে অষ্টভুজাকার ঘাড়বিশিষ্ট গম্বুজ পুরো স্থাপনাটিকে দেয় এক অনন্য নান্দনিকতা। একসময় ইতালীয় মার্বেলে নির্মিত রেলিংয়ে রোমান সম্রাটদের ভাস্কর্য শোভা পেত, যা আজ আর নেই। তবুও তাজহাট রাজবাড়ি আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবে রংপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত এক অমূল্য স্থাপনা হয়ে আছে।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : A H M Hafizul Bari

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
নারায়নগঞ্জ ১ (রুপগঞ্জ) বিএনপির প্রার্থী  মোস্তাফিজুর রহমান ভ

নারায়নগঞ্জ ১ (রুপগঞ্জ) বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভ