ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সোনারগাঁও জাদুঘর: বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ও গ্রামীণ শিল্পের এক জীবন্ত প্রদর্শনী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 22, 2026 ইং
সোনারগাঁও জাদুঘর: বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ও গ্রামীণ শিল্পের এক জীবন্ত প্রদর্শনী ছবির ক্যাপশন: সোনারগাঁও জাদুঘর: বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ও গ্রামীণ শিল্পের এক জীবন্ত প্রদর্শনী
ad728
 আধুনিক সোনারগাঁও বা সুবর্ণগ্রামের ভিত্তি গড়ে উঠেছে হিন্দুশাহী প্রশাসনিক কেন্দ্র বিক্রমপুরের পতনের পর, তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র প্রমাণ দেয় যে, প্রাক-সুলতানি যুগে সুবর্ণগ্রাম একটি আন্তর্জাতিক নদীবন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার তটরেখা বরাবর সমৃদ্ধ নগরী ও বানিজ্যবন্দরগুলোর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। প্রাচীন গ্রীক নাবিকদের লেখা “পেরিপ্লাস” গ্রন্থে এই অঞ্চলের বস্ত্র শিল্পের প্রসিদ্ধির উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে সুবর্ণগ্রামের কারু ও চারুশিল্প বৈশ্বিক পর্যায়েও সমাদৃত ছিল।

সোনারগাঁও শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী হবার কারণে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রাচুর্য্য, ভূমি বিন্যাস, কৃষি উপকরনাদি, চারু ও কারুশিল্পের নান্দনিক উৎকর্ষের জন্যও সুপরিচিত। সমৃদ্ধ উর্বর ভূমি এবং দক্ষ কারিগররা এখানে উৎপন্ন শিল্পকর্মের জন্য এই অঞ্চলকে যুগে যুগে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সুগন্ধিজাত মশলা ও বিভিন্ন কারুশিল্প রপ্তানির মাধ্যমে সোনারগাঁও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

এই ঐতিহাসিক জনপদে ১৯৭৫ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় সোনারগাঁও জাদুঘর বা বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, যা গ্রামীণ বাংলার লোকশিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়েই গড়ে উঠেছে। জাদুঘরটি অবস্থিত বড় সরদার বাড়ি, যা প্রাচীনকালে ঈসা খাঁর জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। এটি কেবল একটি সংগ্রহশালা নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ জীবন, কারুশিল্প ও ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রদর্শনী হিসেবে গড়ে উঠেছে।

জাদুঘরের প্রবেশদ্বার দর্শনার্থীদের প্রথমেই মোহিত করে। ফাউন্ডেশনের প্রবেশ পথেই একটি ভাস্কর্য রয়েছে, যেখানে একজন লোক গরুর গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। প্রবেশদ্বারের কারুকাজ ও নকশা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি। জাদুঘর ভবনের সামনে বিশাল একটি দিঘী রয়েছে, যার তিনদিকে বাঁধানো ঘাট এবং একপাশের দুই ঘাটে রয়েছে দুটি ঘোড়ায় সওয়ার সৈন্যের মূর্তি।

সোনারগাঁও জাদুঘরে মোট ১১টি গ্যালারি রয়েছে, প্রতিটি গ্যালারি বাংলার গ্রামীণ ও কারুশিল্প ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন ধারণ করেছে। এখানে রয়েছে নিপুণ কাঠ খোদাই গ্যালারি, মুখোশ গ্যালারি, নৌকার মডেল গ্যালারি, আদিবাসী গ্যালারি, লোকজ বাদ্যযন্ত্র ও পোড়ামাটির নিদর্শন গ্যালারি, তামা, কাঁসা, পিতলের তৈজসপত্র গ্যালারি, লোকজ অলঙ্কার গ্যালারি, বাঁশ ও বেত শিল্প গ্যালারি এবং বিশেষ প্রদর্শনী গ্যালারি। ১৯৯৬ সালে ফাউন্ডেশন আরও দুটি গ্যালারি স্থাপন করে; এর মধ্যে একটি গ্যালারি প্রাচীন ও আধুনিক নিদর্শনের সংমিশ্রণ এবং অন্যটি সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী জামদানি ও নকশিকাঁথা প্রদর্শন করে।

জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে নকশা করা কাঠের দরজা, কাঠের সিন্ধুক, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, নৌকার ছোট আকৃতির মডেল, পোড়ামাটির পুতুল, পাথরের থালা, পোড়ামাটির নকশি ইট সহ গ্রামীণ জীবনের নানা নিদর্শন। এসব নিদর্শন শুধু শিল্পকর্ম নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক ইতিহাস বহন করে।

সোনারগাঁও জাদুঘর কেবল একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, গ্রামীণ জীবন, কারুশিল্প এবং লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত কেন্দ্র হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের এই উদ্যোগ বাংলার ইতিহাস ও কারুশিল্প সংরক্ষণে এক অমুল্য প্রয়াস হিসেবে স্মরণীয়।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : A H M Hafizul Bari

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রূপগঞ্জে নারীলোভী ভন্ড ও একাধিক পরকীয়াকারী মহিলাসহ গ্রেফতার

রূপগঞ্জে নারীলোভী ভন্ড ও একাধিক পরকীয়াকারী মহিলাসহ গ্রেফতার