ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নির্বাচনে জামায়াতের পরাজয় ও ইসলামপন্থী রাজনীতির কাঠামোগত সংকট

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Feb 20, 2026 ইং
নির্বাচনে জামায়াতের পরাজয় ও ইসলামপন্থী রাজনীতির কাঠামোগত সংকট ছবির ক্যাপশন: নির্বাচনে জামায়াতের পরাজয় ও ইসলামপন্থী রাজনীতির কাঠামোগত সংকট
ad728
নির্বাচনে জামায়াতের পরাজয় ও ইসলামপন্থী রাজনীতির কাঠামোগত সংকট

লেখা:আহমাদ শাব্বীর

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পরাজিত হয়েছে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির কাছে। বিএনপি অনেকের কাছে মধ্যপন্থী দল হলেও তুলনামূলকভাবে সেক্যুলার দলও।
এখন জামায়াতের এই পরাজয়ের ঘটনাকে যদি কেবল ভোটের অঙ্ক, জোটের সমীকরণ বা সাংগঠনিক দুর্বলতার ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করি, তাহলে মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যাবে। কারণ, এই পরাজয় শুধু একটি দলের নয়; এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের সীমাবদ্ধতাকেও উন্মোচিত করেছে। আর সেই সীমাবদ্ধতা হলো রাজনৈতিক ইসলাম বা ইসলামপন্থী রাজনীতির আদর্শগত ও কাঠামোগত সংকট। আর সেই সংকট হলো বহুত্ববাদী সমাজে নিজেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারার অক্ষমতা।
ইসলামপন্থী রাজনীতির আদর্শগত ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যদি আমরা জামায়াতের পরাজয়ের কারণগুলো খুঁটিয়ে দেখি। একটি ইসলামপন্থী দল হিসেবে তাদের ব্যর্থতার অন্তত দুটি যৌক্তিক কারণ আমরা অনুমান করতে পারি। প্রথমত, সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক থেকে জামায়াত প্রায় পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, ইসলামের ভেতরের নানা দল ও ধারাও তাদের পাশে দাঁড়ায়নি।
হেফাজতে ইসলামের একটি অংশ প্রকাশ্যে জামায়াতকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, এমনকি কেউ কেউ জামায়াতকে ভোট দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে ‘হারাম’ বলেও ঘোষণা করেছে। চরমোনাইপন্থী শক্তি জোট থেকে সরে গেছে।
তরিকতপন্থী সুন্নি ও মাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন গোষ্ঠীও বিরোধিতা করেছে। অথচ জামায়াত শুরু থেকেই ইসলামের বিভিন্ন ধারার মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছিল। সব ইসলামি দলের ভোট একত্র করার জন্য তারা দৃশ্যত ব্যাপক প্রচেষ্টাও চালায়। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো—ঐক্যের বদলে বিভাজনই আরও প্রকট হয়েছে।
এই প্রবণতা কেবল বাংলাদেশের নয়—আলজেরিয়া, মিসর, সুদান, তিউনিসিয়া—বিভিন্ন দেশেই একই অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। যখনই কোনো ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল এককভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন ইসলামের ভেতরের বিভাজনগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামি ঐক্যের প্রতিশ্রুতি বা উদ্যোগ প্রায়ই ভেঙে পড়
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। ইসলামপন্থী দল হওয়ায় ইসলামের বাইরের নানান ধর্ম ও বর্ণের মানুষেরা তাকে সহজে গ্রহণ করবে না, এটি বোধগম্য। কিন্তু কেন একটি ইসলামপন্থী দল ইসলামী পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্যান্য ইসলামি দল বা ফেরকাকেও দীর্ঘ মেয়াদে একত্র করতে পারে না? কেন সে ইসলামের ভেতরের বিভিন্ন ধারার কাছেও স্থায়ী গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়?
এর সহজ উত্তর হলো, ইসলামপন্থী রাজনীতি ইসলামের নানা গোষ্ঠীর মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী শক্তি হয়ে উঠতে পারে না। মধ্যস্থতার পরিবর্তে তা নিজেই আরেকটি ফেরকায় পরিণত হয় এবং অন্য গোষ্ঠীগুলোর কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
ইসলামপন্থী রাজনীতি সাধারণত দাবি করে যে সেক্যুলার রাষ্ট্র নৈতিকভাবে অন্তঃসারশূন্য; প্রকৃত ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব কেবল ইসলামি নীতির ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইসলাম এক হলেও তার ব্যাখ্যা বহু। মাজহাব, তরিকা, আধ্যাত্মিক ধারা, শরিয়াহকেন্দ্রিক আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি—সবই ইসলামের ঐতিহাসিক বহুত্বের অংশ। এই ভিন্ন ভিন্ন ধারা ও গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্বও কম নয়। ফলে তারা এমন একটি রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়, যে কোনো নির্দিষ্ট ধারার পক্ষে অবস্থান নেবে না; বরং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে উদ্ভূত দ্বন্দ্বে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে।
কিন্তু একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল তার মতাদর্শগত অবস্থানের কারণেই অন্য ইসলামি গোষ্ঠীর কাছে প্রায়ই আরেকটি ফেরকা হিসেবে প্রতিভাত হয়। সে নিরপেক্ষ ছাতা হিসেবে তাদের কাছে প্রতিভাত হয় না। ফলে বিভিন্ন ইসলামি ধারার গোষ্ঠীগুলো একটি ইসলামপন্থী দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। তাদের আশঙ্কা, কোনো নির্দিষ্ট ধারার ইসলামি গোষ্ঠী ক্ষমতাশালী হলে তার ব্যাখ্যাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে, আর অন্য ধারাগুলোর চিন্তা ও কাজের পরিসর সংকুচিত হবে।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : A H M Hafizul Bari

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করবে ভারত

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করবে ভারত