ঢাকা | বঙ্গাব্দ

রূপগঞ্জে স্বস্তির প্রচারের পর অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা ॥ উদ্ধারের দাবি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Feb 11, 2026 ইং
রূপগঞ্জে স্বস্তির প্রচারের পর অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা ॥ উদ্ধারের দাবি ছবির ক্যাপশন: রূপগঞ্জে স্বস্তির প্রচারের পর অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা ॥ উদ্ধারের দাবি
ad728
আসন্ন সংসদ নির্বাচন
রূপগঞ্জে স্বস্তির প্রচারের পর অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা ॥ উদ্ধারের দাবি

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার-প্রচারণার পর অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। প্রার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ ও নেতাকর্মীদের সহনশীল মনোভাবের কারণে নির্বিঘেœ প্রচারণা উৎসবমুখর ছিলো। তবে নির্বাচনের দিনকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীদের অপ তৎপরতার শঙ্কা করছে ভোটাররা।   
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, সন্ত্রাসীদের হাতে প্রায় বিপুল সংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। আর বৈধ অস্ত্র রয়েছে ১১০ জনের কাছে। এর মধ্যে ৬০ জনের অস্ত্র থানার অস্ত্রাগারে জমা রয়েছে। বৈধ অস্ত্রের মধ্যে একটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
আগের মতো শুধু দেশি ওয়ান শুটার গান নয়, এখন অপরাধীদের হাতে শোভা পাচ্ছে বিদেশী পিস্তল। এমনকি সাব-মেশিনগানের মতো ভয়ংকর অস্ত্র। সীমান্ত থেকে সড়কপথ কিংবা জলপথের গোপন রুট ব্যবহার করে এসব অস্ত্র ঢুকছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়। এরপর হাতবদল হয়ে তা চলে যাচ্ছে ক্যাডার কিংবা ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের কাছে। ভাড়ায় অস্ত্র পাওয়া এখন এই জেলার আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক ওপেন সিক্রেট।
আধিপত্য বিস্তার ও জুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শিল্পাঞ্চল এলাকায় মাঝেমধ্যে গভীর রাতে গুলির শব্দ শোনা যায়। চিহ্নিত দু’জন অপরাধী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানকার কিছু চিহ্নিত অপরাধী চক্র সরাসরি অস্ত্র কেনে না। বড় কোনো অপারেশন বা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য তারা পেশাদার কারবারিদের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকায় এক দিনের জন্য অস্ত্র ভাড়া নেয়। কাজ শেষে অস্ত্রটি আবার নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এই সিস্টেম বা অস্ত্র ভাড়া দেওয়ার সংস্কৃতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জকে এক অস্থির জনপদে পরিণত করেছে। 
রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরগ্যাংয়ের হাতে অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েছে। এই গ্যাংগুলোর লিডারদের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। এদের কাছে অস্ত্র কেবল অপরাধের মাধ্যম নয় বরং এক ধরণের পাওয়ার সিম্বল বা দাপট দেখানোর হাতিয়ার।
রূপগঞ্জের বালু নদী ও মেঘনা বেষ্টিত এলাকাগুলো অবৈধ অস্ত্রের বড় ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। বালু ও ড্রেজার ব্যবসা এবং জমি দখলকে কেন্দ্র্র করে এখানে অস্ত্রের ব্যবহার বেশি হয়। সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্রের বড় চালান অনেক সময় ট্রলারে করে জলপথে এই এলাকায় আনা হয়। পরে বালুর চরে, লেকে কিংবা ইটের ভাটায় পুঁতে রাখা হয়। বিশেষ কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নির্বাচনের সময় এই রিজার্ভ থেকে অস্ত্রগুলো বের করা হয়।
রূপগঞ্জে সাধারণত দুই ধরণের অস্ত্রের উৎস দেখা যায়। ভারত, মিয়ানমার এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর তৈরি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। আর স্থানীয়ভাবে তৈরি করা ওয়ান গুটারগান বা পাইপগানগুলো কুমিল্লা ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে আসে। মেঘনা রুটের কুমিল্লা ও ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র মেঘনা নদী হয়ে আড়াইহাজার বা সোনারগাঁও দিয়ে রূপগঞ্জে প্রবেশ করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে অনেক সময় বালুবাহি ট্রলার বা পণ্যবাহি কার্গোতে, মাছের বাক্স বা আসবাবপত্রের আড়ালে অস্ত্র পরিবহন করা হয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক রুট ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্র রূপগঞ্জে প্রবেশ করে।
অস্ত্রের বড় ট্রানজিট পয়েন্ট রূপগঞ্জ। ঢাকা-সিলেট, এশিয়ান হাইওয়ে ও বালু-শীতলক্ষ্যা নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় রূপগঞ্জ ও চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র অপরাধীদের জন্য একটি সেফ প্যালেজ হিসাবে কাজ করে। রূপগঞ্জের বেশ কয়েকটি লেদ মেশিন কারখানায় পাইপগান তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কাঁচপুর সেতুর নিচের এলাকা এবং নদীরঘাটগুলো ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে অস্ত্রের হাতবদল হয়।
তল্লাশি এড়াতে অনেক সময় সুন্দরী নারীদের মাধ্যমে ব্যাগে করে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র বহন করা হয়। কোন কোন সময় শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কাজে লাগানো হয়। অনেক সময় বড় বড় চালানের অস্ত্র সরাসরি গন্তব্যে না নিয়ে সড়কের পাশের ঝোপঝাড়, বালু বা মাটির নিচে কিংবা পলিথিনে ভরে রশি বেঁধে লেকে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে সুযোগ বুঝে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। 
২০২৪ সালের আগষ্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি আত্মগোপনে যাওয়ার সময় তাদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্রগুলো ছোট গ্রুপগুলোর হাতে চলে গেছে বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র দাবী করেছেন। 
এদিকে অস্ত্র মামলায় গ্রেফতারকৃতদের প্রায় ৭০ ভাগ জামিনে বেরিয়ে আসে। প্রমাণের অভাব ও স্বাক্ষীর অনুপস্থিতি এর প্রধান কারণ। আর উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মাত্র দশ ভাগ ক্ষেত্রে মূল উৎস বা আমদানিকারককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। বাকিগুলো পরিত্যক্ত বা বাহক পর্যায়েই তদন্ত থেমে যায়। 
রূপগঞ্জে দেশি-বিদেশি অবৈধ অস্ত্রের ভয়ানক বিস্তার ঘটছে। সর্বত্রই আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি। সেনাবাহিনী, র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে যে পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হচ্ছে তার কয়েকগুন নিরাপদে চলে যাচ্ছে অপরাধীদের গোপন ডেরায়। আর এতে করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাসিন্দাদের অস্ত্রভান্ডার দিনে দিনে সমৃদ্ধ হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে অস্ত্রধারীরা আরো বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে। ছোটোখাটো ঘটনাতেও অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। 
সেনাবাহিনী, র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার হলেও গত কয়েক বছরে অস্ত্র উদ্ধারে বড় কোন অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। তদন্তের দুর্বলতার কারণে পার পেয়ে যায় গডফাদারেরা। ফলে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্কও অক্ষত থেকে যাচ্ছে। রূপগঞ্জে কথায় কথায় অস্ত্র প্রদর্শন, গুলি করে মানুষ হত্যা, বুলেটের ভয় দেখিয়ে ত্রাস সৃষ্টি যেন অহরহ ঘটনা।
সন্ত্রাসীরা সাধারণত যেসব অস্ত্র ব্যবহার করে সেগুলোর মূল চালান আসে মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম এলাকা হয়ে এবং ভারত থেকে কুমিল্লা ও সিলেট হয়ে। অধিকাংশ সময় অস্ত্র পরিবহনে ব্যবহার করা হয় কিশোরগ্যাং সদস্য এবং শিশুদের। সাধারণত সিএনজিতে আনা-নেয়া করা হয় অস্ত্র। ছোট পিস্তল পরিবহনে মোটরসাইকেলের ব্যবহারই বেশি। সন্ত্রাসীদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্রের আদলে বানানো বেশ কিছু খেলনা পিস্তলও রয়েছে। অস্ত্রের আধিক্য দেখাতে তারা খেলনা পিস্তল ব্যবহার করে থাকে। এসব খেলনা পিস্তলগুলো অনুমোদনহীন ওয়ার্কশপে তৈরি করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। 
র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানে গত এক বছরে রূপগঞ্জে ১১ টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। দীর্ঘদিনের আলোচিত হত্যাকান্ড শিল্পপতি রাসেল ভুঁইয়া, তারেক বিন জামাল, খালেদ বিন জামাল, ছাত্রদল নেতা শফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ার কারণে ক্রমেই অবৈধ অস্ত্রের মজুদের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বাড়ছে।
পুলিশ জানায়, ২০১৭ সালের ২ জুন পূর্বাচল এলাকার একটি খাল থেকে দুটি রকেট লঞ্চার ও ৬২টি এসএমজি, ৪৯টি রকেট লঞ্চার প্রজেক্টর, পাঁচটি ৭ দশমিক ৬২ পিস্তলের ম্যাগাজিন, ৪৯টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ৪৯টি ডেটোনেটর, এসএমজির ম্যাগাজিন ৬০টি, দুটি ওয়াকিটকি, একটি দুরবিন, ১৩টি এন্টেনা, বিপুল পরিমাণ টাইমফিউজ, ইগনাইটার ও এক হাজার ৫২৭টি গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর শীতলক্ষ্যা নদীতে অভিযান চালিয়ে একটি খাল থেকে আরও ৫এসএমজি পাওয়া গেছে। এ অস্ত্রগুলোর রহস্য আজও উম্মোচিত হয়নি। 
রূপগঞ্জ থানা ওসি মোঃ সবজেল হোসেন বলেন, শঙ্কা হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো রূপগঞ্জে হয়নি। চলতি মাসেই যৌথবাহিনী বেশ কিছু অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করেছে। তারপরও আমরা নজদারিতে রাখছি। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আগে থেকে ঘটে যাওয়া সকল নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়ন করা হয়েছে। এছাড়া আট জন ম্যাজিষ্ট্রেট সক্রিয় থাকবেন। যে কোন কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিটের দূরত্বে স্ট্রাইকিং ফোর্সের অবস্থান থাকবে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও মোকাবেলায় সক্ষমতা পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও আনসারসহ বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত রয়েছে। 
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় নারায়ণগঞ্জ জেলায় কোন সহিংসতা ঘটেনি। ভোটাররা যাতে নির্বিঘেœ ভোট প্রদান করতে পারে এবং ভোটর দিন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকবে। 

নিউজটি পোস্ট করেছেন : A H M Hafizul Bari

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
পার্বত্য মন্ত্রীকে জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠন সহ প্রাথমিক শিক্ষ

পার্বত্য মন্ত্রীকে জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠন সহ প্রাথমিক শিক্ষ