ঢাকা | বঙ্গাব্দ

রূপগঞ্জের ইতিহাস: নামকরণের রহস্য, মুড়াপাড়া রাজবাড়ি ও শিল্পায়নের অগ্রযাত্রা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 22, 2026 ইং
রূপগঞ্জের ইতিহাস: নামকরণের রহস্য, মুড়াপাড়া রাজবাড়ি ও শিল্পায়নের অগ্রযাত্রা ছবির ক্যাপশন: রূপগঞ্জের ইতিহাস: নামকরণের রহস্য, মুড়াপাড়া রাজবাড়ি ও শিল্পায়নের অগ্রযাত্রা
ad728
রূপগঞ্জের নামকরণ নিয়ে সঠিক লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে স্থানীয় এবং ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, একসময় এই অঞ্চলে বসবাস করতেন ‘রূপবাবু’ নামে একজন প্রভাবশালী তালুকদার। ধারণা করা হয়, তাঁর নামানুসারে এলাকা ধীরে ধীরে রূপগঞ্জ নামে পরিচিতি পায়। যদিও এই নামকরণের আরও কিছু তত্ত্ব প্রচলিত আছে, স্থানীয় মানুষ এবং ইতিহাসবিদরা ‘রূপবাবু’ তত্ত্বটিকেই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে করেন।

রূপগঞ্জ উপজেলার ইতিহাস নদী, বাণিজ্য ও জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একসময় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নদীনির্ভর বাণিজ্য এবং কৃষিকাজই ছিল এখানকার প্রধান জীবিকা। নদীপথ ব্যবহার করে বাণিজ্য প্রসারিত হলে রূপগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদে পরিণত হয়। নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জমিদারি ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে জমিদারদের বিশাল বাসভবন, প্রশাসনিক স্থাপনা এবং অভিজাত বসতি।

রূপগঞ্জের ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হলো মুড়াপাড়া রাজবাড়ি। এই রাজবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন বাবু রামরতন ব্যানার্জী। পরবর্তীতে জমিদার প্রতাপচন্দ্র ব্যানার্জী এবং বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জীসহ তাঁদের উত্তরসূরিরা রাজবাড়িটি সম্প্রসারণ ও সংস্কার করেন। ঔপনিবেশিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত এই রাজবাড়ি একসময় সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত ছিল। দেশভাগের পর জমিদার পরিবার ভারত চলে গেলে রাজবাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। পাকিস্তান আমলে এখানে হাসপাতাল ও কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র চালু করা হয়। পরে এটি মুড়াপাড়া কলেজে রূপান্তরিত হয়, যা বর্তমানে সরকারি মুড়াপাড়া কলেজ হিসেবে সংরক্ষিত এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন। মুড়াপাড়া রাজবাড়ি রূপগঞ্জের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

রূপগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান হলো ২৩.৭৯৩১° উত্তর, ৯০.৫১৬৭° পূর্ব। দক্ষিণে সোনারগাঁও উপজেলা, উত্তরে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ এবং নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলা, পূর্বে আড়াইহাজার উপজেলা ও নরসিংদী সদর উপজেলা এবং পশ্চিমে ঢাকার ডেমরা, খিলগাঁও, বাড্ডা এবং খিলক্ষেত থানা অবস্থিত। রূপগঞ্জ উপজেলার মোট আয়তন প্রায় ১৭৬ বর্গকিলোমিটার। প্রশাসনিকভাবে, এখানে সাতটি ইউনিয়ন এবং দুইটি পৌরসভা রয়েছে। ইউনিয়নগুলো হলো ভোলাব, মুড়াপাড়া, ভুলতা, গোলাকান্দাইল, দাউদপুর, রূপগঞ্জ এবং কায়েতপাড়া। পৌরসভা দুটি হলো কাঞ্চন এবং তারাব।

পর্যটন ও বিনোদনের ক্ষেত্রেও রূপগঞ্জ সমৃদ্ধ। জেলার জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলোতে রয়েছে রাসেল পার্ক, জিন্দা পার্ক, মুড়াপাড়া রাজবাড়ি, চারিতালুক ও পাল বাড়ী, সুবর্ণগ্রাম, পন্ড গার্ডেন বা কুদ্দুস পার্ক, লা-রিভারিয়া রিসোর্ট, শীতলক্ষ্যা ওয়াটারফ্রন্ট রিসোর্ট  শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো পর্যটন সম্ভাবনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রূপগঞ্জের মোট জনসংখ্যা ৪,০৩,৬২৯ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ২,১৫,০১৯ জন এবং মহিলার সংখ্যা ১,৮৮,৬১০ জন। মোট খানার সংখ্যা ৮১,৭৬৪ এবং পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা ৪.৯৪ জন। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ২,২৯১ জন প্রতি বর্গকিলোমিটার। পুরুষ ও নারীর অনুপাত ১১৪:১০০। মোট ভোটার সংখ্যা ২,৭৪,৭০৭ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৩৮,২০৯ এবং মহিলা ভোটার ১,৩৬,৪৯৮ জন।

যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে রূপগঞ্জ উন্নত। এখানে রয়েছে ১৩৮ কিমি পাকা রাস্তা, ৪৪ কিমি আধা-পাকা রাস্তা, ৪১৯ কিমি কাঁচা রাস্তা এবং ৪৫ কিমি নদীপথ। মোট রাস্তা সংখ্যা ৩৫৯ এবং মোট ব্রিজ ও কালভার্ট ১৪১। শীতলক্ষ্যা নদী এখানকার বাণিজ্য এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার হার রূপগঞ্জে প্রায় ৯৮%। উপজেলায় রয়েছে ৮২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ৩টি মহাবিদ্যালয়। মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে রয়েছে ৮টি দাখিল মাদ্রাসা, ৪টি আলিম মাদ্রাসা, ৭টি ফাজিল মাদ্রাসা এবং ২৮টি এবতেদায়ী মাদ্রাসা।

একসময় কৃষিপ্রধান এলাকা হলেও বর্তমানে রূপগঞ্জ শিল্প ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নারায়ণগঞ্জ জেলা ঐতিহাসিকভাবে পাট শিল্পের জন্য বিখ্যাত। রূপগঞ্জে গড়ে উঠেছে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, স্পিনিং মিল, ডাইং কারখানা এবং বিভিন্ন ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এই শিল্পায়নের ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অর্থনৈতিকভাবে অঞ্চলটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তবে শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান।

রূপগঞ্জ উপজেলা শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধুনিক উন্নয়নের এক অনন্য মেলবন্ধন। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই জনপদ তার নামকরণ, জমিদারি ইতিহাস এবং মুড়াপাড়া রাজবাড়ির মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত হলে, রূপগঞ্জ হতে পারে অতীত ও বর্তমানের এক অনন্য সমন্বিত উপজেলায় রূপান্তরিত।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : A H M Hafizul Bari

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়ে জাহাজের শ্রমিক নিখোঁজ।।

রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়ে জাহাজের শ্রমিক নিখোঁজ।।